নারায়ণের নরসেবা

নারায়ণের নরসেবা

"শান্তাকারণ ভুজগশয়নম পদ্মনাভং নিশ্চিতাং
             বিশ্বাধারাম গগনসদৃশং মেঘবর্ণ শুভাংগম ।
                   লক্ষ্মীকান্তঃ কমলনয়নঃ যোগীবর্ধ্যানাগম্যম
                বন্দে বিষ্ণুণ ভবভয়হরং সর্বলোকৈকনাথম"

 

 নারায়ণের নরসেবা
 
শ্রীবিষ্ণুঅবতারম ∞ কাব্যিক অবতারণা

 

পুঁটি মাছের মুড়ো ∆ মৎস অবতার

গোড়ার দিকে মার্তন্ড থেকে ছিটকে আসা দৈনিক আপাতরেখার নিয়মে খসে পড়ে পৃথিবী-- লঘুপদে চোখ রাখলে স্পষ্টত দেখা যায় চামড়ার উপরে দেখা যাচ্ছে নশ্বর নিউরনের অনন্ত শয্যা। পৃথিবীর বয়স মোটে মাস পাঁচেক, স্নিগ্ধ হাড়ে তখনও গড়িয়ে পড়ছে নম্র আবেগ, মাংসপিন্ড চিনে উঠতে পারেনি কাক শকুনিদের চিরাচরিত ষড়যন্ত্র। তাই বলে কি যকের ধন খুবলে খাবে না অভুক্ত মুখ্য পিশাচ? চুরি গেলো প্রজ্ঞা দেবতার ঘুমের ঘোরে। চোখ কচলে উঠে বসলো পদ্মনাভ। সদ্যজাত মেদিনীর পেটে যে সমুদ্র খেলা করে, সেই অতিকায় উদকে চতুর্বেদ জমা রেখে দরজায় মুখ ঢেকেছিল হয়গ্রীব। ঈশ্বর খুলছে শরীরী গয়না, গুছিয়ে রাখছে সুদর্শন, মনিপুরী তেজে নিজেকে ভেঙে খর্বকায়া মাছের শরীরে ঢেলে দিলেন যাবতীয় তেজ। নৈসর্গিক সূত্র ধরে মাছের শরীরে বেড়ে উঠছে মোহিনীমোহন বাসুদেব। মেদিনী পেটে দোল খায় প্রজ্ঞা, পেট ফেঁপে বেরিয়ে আসে হাজার বছরের সঞ্চিত পরিশ্রম। গুছিয়ে রাখা বেদের প্রদীপ্তি খুঁজে নিচ্ছে ঈশ্বরের পাখনা --সাঁতরে পেরোচ্ছে আশমানি রঙা নিরঞ্জন। ধাক্কা লাগলে নড়ে ওঠে পৃথিবীর জঙ্ঘা, হুড়মুড়িয়ে মেখে নিচ্ছে জ্ঞানের জ্যোতিস্ক, মাছের পেটে ঢুকে গেলো শব্দ, কানকো থেকে বেরিয়ে এলো পদ্মফুলের পাঁপড়ি --- জগৎ জানলো মৎস অবতার, কিন্তু এ আসলে ঈশ্বরের চেষ্টা।

ADVERTISEMENT

 

 

কচ্ছপের কামড় ∆ কুর্ম অবতার

পারিজাতের দাঁত ছিঁড়ে বেরিয়ে আছে তাপদগ্ধ মালার জিভ, নিষ্পাপ দ্রুমারী জানে না, এদিকে আত্মশ্লাঘার ঠুমকি চালে চোখ ফিরিয়ে নেয় দেবরাজ। বৈকুণ্ঠবুকে লাথি জুটেছে, ছুঁড়ে ফেলেছে ভক্তি, ভজন এড়িয়ে ভোজন চলছে... চেটে যাচ্ছে রজঃ তমো'র আয়েশী থালা।

নারদ বীণায় ছেদ পড়েছে, অসুখ করছে অহরহ। সিয়েস্টা-পদ্ধতি মেনে পাশ ফিরছেন নারায়ণ, ঠোঁট চুঁয়ে ভবিষ্যৎ গড়াচ্ছে, চোখের পাতায় ঘুমিয়ে আছে সাচ্ছন্দ্য। এমন অসুখের বিকেলে আড়মোড়া ভেঙে সন্ধ্যের আয়োজনে ডাক দিলেন সভা-পারিষদ, জানালেন ---'সন্ধি করো এখনই নতুবা অমৃত পানে অমরত্বে দেবত্ব প্রাপ্তি ঘটবে'।

অমরত্বর দানে কৃপণ দেবতা নদীগর্ভে ছুঁড়ে ফেললো সঞ্জীবনি সুস্বাস্থ্যর ওষুধ --কালক্রমে সে জল পূর্ণ যুবতী হয়ে উঠলো --এক ডোবা সুখ ছেচা জল তখন লালা ঝরানো অমৃত। রাজঁহাস বিদ্যায় পারদর্শী সুর অসুর মিলে ক্ষীরদ সাগরে ডুবিয়ে দিচ্ছে মন্দারের দৈত্যবৎ দেহ। কাঁচা দেহজ গন্ধে শরীর ছেড়ে দিলো মন্দার। মুহূর্তে স্মৃতি হারালো কি তার কাজ, অভিষ্ট সাধনের চেয়ে ক্ষীরদ অবগাহনই আদ্য হয়ে উঠলো। নাজেহাল সুর-অসুর পিনাকীপানির বাসকী দাবি করলে, সেই অহিকন্যাই হয়ে উঠলো উদ্দেশ্য সাধনের দড়ি।

ডুবতে থাকা মন্দারের পিঠে গলায় হাতে বাসকীর রজ্জু। ক্ষীরদের গর্ভ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে সুধা। ক্ষীরদ প্রেমে কাবু মন্দার আরো ডুবে যাচ্ছে, ছিঁড়ে যাচ্ছে বাসকীর পোক্ত খোলস। উফফ কি নৃশংস এই লোভ, অসুখ সারাতে মারতে পারি যাবতীয় পরিবৎ নিমিষ, হনন করা যায় প্রাণ। আবারও হৃদপদ্ম কমলাসন ফেলে কুঁজো হলেন যশোদা বৎসলা, মন্দারের পেটের তলায় শুয়ে পড়লো কূর্ম, রবারের মতন বাড়তে লাগলো যতদূর উঠলে মন্দার ঢেলে দেবে এতদিনের জমা জীবন। একটু সুখের তাড়নায় বাসকীর চামড়া চুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে ক্লান্তি, কুর্মের পিঠে আঁকা হচ্ছে বলিদানের চাকা, ক্ষীরদ নিঃস্ব হচ্ছে আর অমৃত সুধা ঢকঢক  করে গিলছে দেবতা, কাড়াকাড়ি করছে পিশাচ। অলংকারশূন্য কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে যাবতীয় অসুখের। কুর্ম অবতারনায় লেখা হয়েছে মন্দারের স্মৃতি আর জীবনের প্রতি অদম্য লোভ।


 

শূকরের গোঁ ∆ বরাহ অবতার

অনেকগুলো দিন পেরিয়ে আসার পর, মাটির বয়স বাড়ে, কিশোরীবেলার সূর্যাস্ত হলে, তারুণ্যের কুমুদ ত্রিভঙ্গি সাজে দাঁড়ায় আকাশপটে--পৃথিবী মোহিনীরূপে ঢেকে রাখে রাক্ষুসে চোখ। বৈদিক প্রজাপতির জ্ঞানজাত আত্মজর সাধ জাগে বিষ্ণু দর্শনে, শিশুবেশে জনা চার আসে বৈকুণ্ঠধামের দরজায় -- ক্লান্তি কাচিয়ে অপনোদনে ছিলেন ধরেশ, জয়া বিজয়া আটকে দিলে, চতুর্বগ শিশু বেজায় গোঁসা করে। অভিশাপ বড়োই ভয়ানক, তারপর খসে গেছে কত গ্রহাণুরা, কেটে গেছে অক্ষয় বেলার কাল --দিতীর গর্ভে জন্মায় সেই সরিয়ে রাখা দৈবজ পাপ  হিরণ্যকশিপু - হিরণ্যাক্ষ। যে অভিশাপ শিক্ষিত চোখ থেকে সম্প্রচারিত হয় তার দায়ভার তুলে নেয় নক্ষত্ররাজি, সঙ্গে একটা সূর্য আর পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ। পোয়াতির অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে পাঁচ পদার্থ, সলিল সমাধিতে ডুবে যাচ্ছে স্বর্গ। অতিকায় দানবদ্বয় অতীতের আক্রোশে হাওয়া করে, কাঠের জালে উথলে ওঠে প্রতিশোধ --- উগ্রন্থ ক্রোধে ঈশানে হাসতে থাকে ক্ষণপ্রভা নিনাদ, সেইরাতেই চুরি যায় আস্ত পৃথিবী, অখণ্ড সমুদ্রবুকে। পৃথিবীর সলিল সমাধি ঈশ্বর সহ্য করে না -- তবুও ঈশ্বরের নাক কাঁচা গন্ধ পায় না মেদিনীর। চামড়া ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ে শূকরের শরীরে, জলের গন্ধে ভাসছে পৃথিবী, বরাহ সাজে ঘুরছে নারায়ণ --ঘ্রান নিতে নিতে দেখা হলো দুই নারকীয় জনার সাথে। শরীর চুঁয়ে পাপ, চোখ বেয়ে নেমে আসছে প্রাক্তনী প্রতিশোধের কবিতা। দেবতার সাথে অসুরের যুদ্ধ বড়োই বিশেষত্বহীন গল্প তেমনই তার ক্লাইমেক্স --- বিদিত বিদিশা। কদুত্তরের পুরস্কার -- বরাহ অবতার কৌতূকে ধারণ করলো ভেজা মেদিনীর কাঠামো, পৃথিবী গড়িয়ে নেমে আসছে উদ্বৃত্ত সামুদ্রিক লাবণ্য, খাতার পাতা মিলিয়ে রাইট চিহ্ন বসাচ্ছেন কমলযোনি ব্রহ্মা।


 

সিংহ যদি কলম ধরতে পারতো ∆ নৃসিংহ অবতার

পিশাচের ঔরসে ঈশ্বরের জন্ম -- কয়ধু জঠরে হরিনাম শুনছে প্রহ্লাদ, হিরণ্যকশিপুর ঘিলু ছিঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে ব্রহ্ম পদ্মযোনি। যুগের গান সুর বদল করে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে ঋতু --লোলুপ নজরে চেয়ে থাকে প্রার্থনা, ভক্তির থালা পেতে বসে থাকে অমরত্ব। প্রনিধানে ধ্যানমগ্ন নরক, ঈশ্বর তুষ্ট হন প্রেত সাধনায় আর মানুষ দেখিয়ে দেয় ভবিষ্যতের টাইটানিক। এমত অবস্থায় হরি চুরি করেন প্রহ্লাদমন, আসন পেতে দিয়েছে ধৃতিরুপা লক্ষী। ব্রহ্মবরে ঋদ্ধিমান নরক ফিরে আসে রাজত্বে, রাজসিংহাসনে প্রতীয়মান চাইছে শুক্রবিদ্যার অবগাহন, শিশু প্রহ্লাদকে শিক্ষা দেয় শুক্রপুত্রদ্বয়, ষন্ড-অর্ঘক। শিক্ষার পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা হয়, নরকের কোলে বসে আদর খাচ্ছে ঈশ্বর --তবুও সতরূপী ঋভু ভোলে না নয় তত্ত্ববোধ -- শ্রবণ, কীর্তন, বিষ্ণুস্মরণ, পাদসেবন, অর্চন, বন্দন, দাস্য, সখ ও আত্মনিবেদন। মুহূর্তে পিশাচ বুঝে যায়, ঈশ্বর কোলে তুলে আদর করলে মৃত্যু আরো কাছে এগিয়ে আসে, ঘৃনায় ছুঁড়ে ফেলে দান করলো মৃত্যুদণ্ড। ঈশ্বরের মৃত্যু -- পিশাচের হাতে....বৈতরণী থেমে যায়, সূর্যের কক্ষপথে দাঁড়িয়ে যায় জন্ম, মৃত্যু খসে নেমে আসে নৃসিংহ অবতার। চোয়াল ছেঁড়া হাসি, নখের আগায় ক্রোধ আর আশি লক্ষ জন্ম-পারাবারে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা। হিরণ্যকশিপুর পাঁজর চিরে বেরিয়ে আসছে মুক্তি, ঢুকে যাচ্ছে নারায়ণ, অসহ্য রাগে ফেটে পড়ছে মাটি, হাহাকার হুঙ্কারে কেঁপে ওঠে দুধসাগরের অত্রী। স্নেহের কাছে নতজানু হতে হয় দেবতাকে, ঐকিক নিয়ম মেনে খোলস ছাড়ায় মৃত্যু বেরিয়ে এলো পঞ্চনাগের অধীশ্বর, সেকি আলো, সেকি জীবন, সেকি স্বর্গ।

 

 

বামাচার ∆ বামন অবতার

অদিতির চোখ ভেঙেছে কান্নায়, বৈবস্বতের কাল মেনে সপ্তম মনুর সময় শুরু হয়। কালে কালে পিশাচ জন্ম এক গতানুগতিক ঘটনা, পিশাচ দমনে ঈশ্বরের আবির্ভাবও ততোধিক সাবলীল লীলা। জগৎ এক অনুপম স্বর্গ নরকের নাট্য প্রসেনিয়াম। প্রহ্লাদ পৌত্র,বলি শুক্রাচর্যের আশীবর্চনে প্রাণ ফিরে পায় -- দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যর আদেশে শুরু হয় বিশ্বাজিত যজ্ঞ। দিনান্তের স্বর্গ খুবলে খেয়ে গেছে শকুন, দেখা গেছে পৈশাচিক সিন্ড্রোম। যজ্ঞবেদীতে জ্বলছে কামনা, ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন বলি --বেহাত হবে মেঘের বাড়ি। অদিতির কান্নায় ভেসে যাচ্ছে মাতৃত্ব, নারায়ণ গায়ে আলো মেখে কাঞ্চনকায়া ত্যেজে পড়ছে কর্ণকুন্ডল, যজ্ঞোপবীত গায়ে, হাতে কমন্ডুলু -- যেন হাজার ব্রহ্মাণ্ডের সূর্যতেজ, মেঘের পেটে রাখা অশ্বিনী ভরণী সমেত নেমে এসেছে গডগডে ব্রাহ্মণ পুত্র। দিব্য জ্যোতির্ময় আলোয় হেসে উঠছে ঈশ্বর, জয়ের যজ্ঞ থামিয়ে উঠলো রাজন। প্রণিপাত হয়ে জিজ্ঞেস করলে কি চাই -- ঈশ্বর বললে জমি। যেটুকু খন্ড তাঁর পায়ের তিন অংশের মধ্যে ধরবে, মোটে সেইটুকু।


দৈত্যরাজের সম্বিৎ ফিরতে সে রাজনকে না করলে-- ঈশ্বরের তিন অংশে তিন কাল ধরে, ধরে যায় হাজার যোনিজন্ম, পাপ পুণ্য সময় পাত্র মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে যেমন করে পশ্চিমী মেঘে আদিত্যরাজ মূর্ছা যায় প্রতিশ্রুতিহীন যামিনীর কাছে। রাজন আর ভাবতে পারছে না, অল্প অল্প করে ডুবে যাচ্ছে, বাঁধা পড়ছে বিষ্ণুধমনী ডোরে। হেরে যাচ্ছে এক গুরু, বিমর্ষ চিৎকারে ভেসে আসছে নারকীয় উদ্দীপনা। তখনও রাজন বলছে --- আমি মরিনি, আমি মরবো না, থেকে গেলাম দেব অন্তিম অনন্তশয্যার শেষ ছত্রের জন্য।

 

 

রণচন্ডে ∆ পরশুরাম অবতার

মধ্যম জ্যৈষ্ঠর দ্রাঘিমাংশ বরাবর ভেসে ওঠে দিগম্বরী মেদিনী ক্যানভাস, উন্মাদ বিজ্ঞানী এঁকে চলেছে চলেছে রবিমার্গ -- অঙ্কের মাস্টার বিকারে ঢেলে রাখছেন আমর্ষ। জঠরাগ্নির জ্বালায় ভুগছে রেণুকা --গর্ভে টগবগ করে ফুটে উঠছে পরশুরাম। জমদগ্নির ব্রাহ্মণত্ব লোপ পাইনি ক্ষত্রিয় শরীরে তবুও মনে হচ্ছে, জরায়ু চিরে বেরিয়ে আসছে অগ্নিশিশুর মাথা।  বামেতর তেজে পাশ ফিরছে দহন, পুড়ে যাচ্ছে পোয়াতির মণিপুর। বৈকুণ্ঠভোগে পাত পেরেছে মানুষ, ঈশ্বরের খিদে পায় না। মাঝেমাঝে ভোজ খেতে পালিয়ে আসে খিদে, কুপিত ক্রুদ্ধ পরশুরামের কোনো পিপাসা নেই --জন্ম ইতিহাসের যকৃত দেখে লালা পড়ছে শেয়াল পন্ডিতের। চোখের কোণে চিকচিক করে কামুকতার স্নানযাত্রা, রেণুকার মাথা কাঁটা যায় ছেলের দারুন ঘায়ে। মাতৃহত্যার পাপ-- শরীর জুড়ে তাড়ি বয়ে যায়, পচনশীল প্রত্যঙ্গ বের করে আনা হয়, কাপড়ে বেঁধে ফেলছে অভিশাপ। ঈশ্বরের দুই প্রজন্ম দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি, জনকের সভায়, হরধনুভঙ্গ করতেই যুদ্ধ বাঁধায় বীভৎস দহন --মাটির মতন শান্ত রাম অগ্নির মতন জ্বলন্ত পরশুরাম। পৃথিবীর কক্ষপথে অমাবস্যার বলয় ধরে আজও হেঁটে বেড়ায় চিরঞ্জিবী, অপেক্ষা আগামীকালের ঈশ্বরের।

 

 

রামের সুমতি ∆ রাম অবতার

যুগ পাল্টাচ্ছে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে ঈশ্বরও। দুই অক্ষরের তারক মন্ত্র যা উচ্চারণে রমণীয় ভাব জমাট বাঁধে, শ্রীবিষ্ণুপুরাণে গ্রথিত বিষ্ণু স্তোত্র পাঠে ও সহস্র নাম জপে যে কল্যাণ, সেই সমতুল্য পুণ্যলাভ হয় এই দুই অক্ষরের তারক মন্ত্রে ---রাম। পৃথিবীর প্রিজম পার হয়ে চলেছে ঈশ্বর --ধরা পড়ছে তাঁর ইন্দ্রধনু, মৌটুসীর ডানা খসে নেমে আসে রোহিনী আর আলোর প্রতিসরণে দেখা যাচ্ছে রামের বিচ্ছুরণ।

দশরথ শ্রেষ্ঠ পুত্র রাম এক ছটাক আলোর নাম, নির্মেঘ-বিশ্রব্ধ চোখেও ঋজুতার বর্ণ বিশ্লেষণ সোজাসুজি প্রতিভাত হচ্ছে। লঙ্কেশরাজ একাগ্রচিত্তে স্নেহ করেছে জাগতিক অনুরাগী ধনাঢ্যতা, দক্ষিণ দিকে রেখেছিলো কৌশিক, প্রলয়কালে নিস্তার পায়নি দৃপ্ত আওয়াজে মহাকাল বন্দনায় --- কৈলাসে টিকতে পারেনি তাঁর তান্ডব স্তোত্র---

                ।। 'জটাভুজংগপিংগলস্ফুরত্ফণামণিপ্রভা
               কদংবকুংকুমদ্রবপ্রলিপ্তদিগ্বধূমুখে ।
                        মদাংধসিংধুরস্ফুরত্ত্বগুত্তরীযমেদুরে
               মনো বিনোদমদ্ভুতং বিভর্তু ভূতভর্তরি'।।

 

ঈশ্বরের সামনে ভক্তি কাজ করে না, মন্ত্র বিকল হয়ে পড়ে থাকে, পঁচে যায় অর্ঘ্য, কাক শেয়ালে মুখ দেয় না প্রসাদে। একমাত্র কাজে আসে মানস। মনের একেবারে গহীন গুহায় লুকিয়ে রাখা যাবতীয় অভিষ্ট সে অনবদ্যভাবে টেনে বের করতে জানে --দেবতারও উদ্দেশ্য থাকে, সেই উদ্দেশ্য সফল করতে সে আবশ্যিক ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণ অনিবার্য করে তোলে মানব অবতারের হাতে। রাম, সেই বিষ্ণু অবতার যা প্রাচীন তিমির মেঘমেদুরতায় তড়িচ্চুম্বকীয় বর্ণালীর পৌনঃপুনিকতা নির্মাণ করে।

 

 

অগত্যা মধুসূদন ∆ কৃষ্ণ অবতার

এগারো বছরের বৈরিতায় জল থেকে গড়িয়ে গেছে চোখ, হাহাকারে লেখা হয়েছিল পরজন্ম। সরযু নদীর ঘাঁটে বসে মাটি আঁকড়ে কেঁদে উঠেছিল রমা। এ পোড়া দেশে রামও ডুবে যায় মরে যায় সীতারা --ডুকরে উঠে বলেছিলো, এই জন্মের সব বিচ্ছেদ, পরজন্মে মিটিয়ে দেবো। তারপর তৈরী হলো একশত দেশ --হাজার খানেক রাষ্ট্র আর অখণ্ড ভারতে খন্ডাকার দুটো জমি আর এক আভূমিলুন্ঠিত ত্রিদিব। এগারো বছরের দীর্ঘ বিরতির পর দেখা হলো এক আশমানি নীলাম্বর ও এক কামিনী কাঞ্চনার। প্রেম যেখানে মৌলিক নয়, বিরহ সেখানেই আস্কারা পায়। যবনিকায় ছেদ করে মাথা গলায় তামাসিক নাতিদীর্ঘতা। কালক্রমে বদলে যাচ্ছে রাষ্ট্র, বদলে যাচ্ছে পরিবার। পারিবারিক নাটকে ঢুকে পড়ছে নারায়ণ সঙ্গে অক্ষৌহিনী নারায়ণী সেনা --যুদ্ধ হবে তৎপুরুষের সাথে বহুব্রীহির। রথের সারথি ঈশ্বর --নীল রঙের দেহযষ্ঠীতে আধ্যাত্মতার স্বেদ। কৃষ্ণবিলাসীনি রাই অভিশপ্ত --অভিশপ্ত ছিলো জনক কন্যা সীতা ---সময়ের আবর্তনে নরকের বিবর্তন ঘটে --বদলে যায় অচ্যুত, যুদ্ধের রীতিনীতি বদলায়, বদলে যায় ঈশ্বরের অবতারেরা। ঈশ্বর বৈকুণ্ঠধাম ছেড়েছেন আজ প্রায় তিনযুগ, এখানের ঈশ্বর বৃন্দাবনী সারঙ্গে বাঁশি রেখেছে, ময়ূরপুচ্ছে পালন করেছে শ্লাঘা, শ্রীরাধিকার আর্তনাদে অভিসার আর যাজ্ঞসেনীর শ্লীলতায় রেখেছে রক্ষা। আধ্মাত অর্জুনে বিশ্বরূপ আর দেবব্রতর শরশয্যা। আহ্নিক গতিতে গ্রহ ঘুরতে ঘুরতে পাশ ফেরে রাক্ষস --শত্রুর মুখেও তখন শোনা যায় বেদবাক্য তাই ঈশ্বরও খানিক চতুর হয়ে ওঠে।

 

 

সুজাতার পায়েস দান ∆ বুদ্ধ অবতার

প্রতিরাতে অল্প অল্প করে অনাক্রমার সেলাই খোলে সিদ্ধার্থ, রাতের আহার, দিনের বিহার সবই কেমন যেন প্রতিকূল অসংগতিপূর্ণ নিশিডাকের মতন শোনায়। সবইতো আছে তবুও যেন নেই। ঈশ্বর যখন মানুষ হয় মাঝেমাঝে জাগতিক প্রপঞ্চে তাঁরও রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়, পরমাত্মা ধরতে চায় না জৈবিক কোষের আয়তক্ষেত্রে, প্লবতার সূত্র মেনে ওজন মাফিক জল সরে যায় --আর্কিমিদিস জিততে থাকলে বর্তমানের হাড়েমাসে মানুষের ক্ষয় হয় --মানুষ মানুষ দেহ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ঈশ্বর। আবশ্যিক নিশ্চিন্ততা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, রাজপথ ধরে ছুটছে পদ্মনাভ। যে জগতের অধীশ্বর, যাঁর সুদর্শনে গ্রহণ লাগে, ভৌগোলিক নিশানা বদলে যায় অতর্কিতে, উদ্ধত মহাকালের হাত ফস্কে বেরিয়ে যায় ভগ্নপ্রায় সতী, স্থিতির সার্বভৌম নৃপতি... তাঁকে কিনা রাজ্যপাটের কাজ? বোধিবৃক্ষের আসনে উপবিষ্ট গৌতম তখনও বুদ্ধ হয়ে ওঠেনি। মানব জন্ম যেন কেমনতর, দেবতা খসে পুরুষ হলে দেবত্ব থেকে যায় তবে তা জাগতিক শঠতার সাথে মিশতে মিশতে নারকীয় হয়ে ওঠে। এই জগৎ বড়োই মায়াময়, এখানে সকাল থেকে রাত হতে দেখলেই আমরা আটকে পড়ি ভবিষ্যতে --মোক্ষ লাভ এক দুরহ সন্ত্রাসের নাম। কৃচ্ছসাধনে দুর্বল তথাগত, পন্ডিতের সেতারের মধ্যম তারে চোখ পাতলেন। কি অসম্ভব কৃশ অবস্থা, অভিষ্ট পূরণে পুজো দিতে আসা সুজাতার অর্পিত পায়েস খেয়ে অর্ধমানব -অর্ধঈশ্বর বসলেন বোধিসত্ত্ব হতে। সাধনার সংকল্পেই রোজ অল্প অল্প করে ছিঁড়ে যাবে মানবদেহের রাহিত্য, ফুটে উঠবে বুদ্ধ --বেরিয়ে আসবে কেশব।

 

 

একশো বছর বৃষ্টি হলে ∆ কল্কি অবতার

যতবার আমার ক্লান্ত লেগেছে, কাঁদতে পারিনি তাও ---ঠিক গুনে গুনে ততবার গলার কাছে পাকিয়ে উঠেছে ঈশ্বর। আমার আবার সবই শোনা গল্প, পেন্সিল চিবিয়ে বারবার ফেলে দিয়েছি, তবুও মলাট মুড়ে ব্যাগে পুরিনি চাঁদমামা। ঠোঁট বেয়ে লালা গড়াতো যখন শুনতাম এখনও নাকি পঞ্চ অমর নীরব অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে শেষবারের মতন ঈশ্বর দেখবে বলে। আজকাল আর অতিকায় হুঙ্কার তোলা অসুরের জন্ম হয় না, তাই আর অষ্টভূজা দেবীরও দরকার পড়ে না। এখানের পিশাচ মন্ত্র জানে না, সাধে না ঈশ্বরকে, আসনের তলায় রেখে দিয়েছে লবণ লবণ সায়ানাইড। প্রতিবাদ হয় না তো আজকাল আর, কে করবে প্রতিবাদ? প্রতিবাদ করতে গেলে মানসে তাঁকে ধারণ করতে হয়, তাই এখানে শরীর খসলেও ঈশ্বর ঝরে না। মার্শলোর চাহিদা অনুক্রমের পদ্ধতি শুধুই মুঠোফোনে পাওয়া যায় --বিষন্নতা একটা বিলাসিতা আর প্রেম শুধুই অকাট্য নন-প্লেটনিক। আকাশ জুড়ে ঈশ্বর বসে আর মাটি জুড়ে হকার। শুনেছিলাম আজও নাকি মাদার মেরি যীশু পেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রসব যন্ত্রনায় গর্ভনালী খুলে বেরিয়ে আসে শোক, একি সত্য? আরো একশো বছর বৃষ্টি হলে ধুয়ে যাবে সব পাপ, তারও শতবর্ষ পরে জ্বলে উঠবে গ্যালাক্টিক সেন্টারের আলো, ছায়াপথ ধরে হেঁটে আসবে কালপুরুষ ---আমি ঠিক জানিনা, সেই কি ঈশ্বর? তাঁরই নাম কল্কি?

 

#poem #poetry #prose #article #seo #spirituality #spiritual #God #hinduism #lordvishnu #HARI #avatar

Redirect to Address page

Updating Subscription details

Redirecting...Please Wait