ভ্রমণ কাহিনী - পাহাড়ি পথে হাঁটাচলা

ভ্রমণ কাহিনী - পাহাড়ি পথে হাঁটাচলা


পাহাড়ি পথে হাঁটাচলা

(স্বদেশ টাইমস শীতকালীন সংখ্যা ২০২০ তে প্রকাশিত)

 

২১শে ডিসেম্বর উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে উঠে পড়লাম সন্ধ্যায়, পরের দিন ২২শে ডিসেম্বর সকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে গাড়িতে চলা শুরু হল, শিলিগুড়ির উপর দিয়ে যাবার সময় মহানন্দা নদীর পর বালাসন নদী পার করে এগিয়ে গেলাম মিরিক এর দিকে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়, আরেক থেকে আরেক শুরু হল উপরে ওঠা, উঠে চলা। পথের ধারে গাছে গাছে কমলালেবু ফলে আছে দেখলাম। মিরিকে দেখা হল টিংলিং ভিউপয়েন্ট,আর একটা বিরাট লেক। সেখানে ঘোড়ায় চেপে লেক প্রদক্ষিণ করলো আমার সাত বছরের ছেলে। সেই রাত্রিটা  কাটানোর জন্য আগে থেকেই বুকিং করে রাখা ছিল লেপচাজগতে। লেপচাজগত দার্জিলিং এর একদম বিপরীত পাহাড়। লেপচা উপজাতির বাসস্থান ছিল সেখানে এখন তামাঙ - লামা আরো অনেক উপজাতির মানুষেরাই মিলেমিশে থাকে। সেখানে যখন পৌঁছলাম তখন আকাশের লাল রং খানিক ফিকে হয়ে গেছে। আমাদের অভ্যর্থনার জন্য বহু প্রতীক্ষিত সূর্যটা অভিমান করে নীল পাহাড়ের পিছনে গিয়ে লুকিয়েছে।  ফরেস্ট ভিলেজ হোমস্টে 'রেনু'তে পৌঁছে অনুভূত হল কাপুঁনি দেওয়া ঠান্ডা। যেহেতু এখানে লোক সমাগম এবং গাড়ি চলাচল কম তাই এই নির্জন হিল ফরেস্টে ঠান্ডাটাও খুব বেশি অনুভূত হল।

ADVERTISEMENT

 

লেপচাজগতে দুটি সুন্দরী স্কুল কলেজ পড়ুয়া আমাদের সেবায় লেগে থাকল। গরম জল পৌঁছে দেওয়া, কফি স্ন্যাক্স বানিয়ে দেওয়া। আমাদের আব্দারের যেমন শেষ নেই ওদেরও মুখে নির্ভেজাল অমলিন হাসির শেষ নেই। পাহাড়ি ঠিকানায় প্রথম রাতটা কাটিয়ে ২৩শে ডিসেম্বর ভোরে দেখা হল স্লিপিং বুদ্ধ। কাঞ্চনজঙ্ঘার কখনো লাল কখনো সাদা রং বদল। পাহাড় কেটে সুন্দর পিচের রাস্তা চলে গেছে বহু দূর। একদিকে বিশাল উঁচু পাইন, ওক গাছ মাথা তুলে রাস্তায় ছায়া ঘনিয়েছে অপরদিকে বিশাল নীচু খাদ। কোথাও আবার নীচের অন্য কোন গ্রাম, ছোট ছোট কাঠের বাড়ি, খেলার মাঠ কিংবা ক্ষুদ্র স্কুল ঘর দেখা যাচ্ছে। একটু বেলা হলে আমরা সেখান থেকে ৪ কিমি অপূর্ব সুন্দর পথে হেঁটে দেখে এলাম সুখিয়াপোখরি বাজার। বেড়ানোর গ্রুপে প্রচুর মানুষ থাকে যারা কোথাও গেলেই কিছু না কিছু মার্কেটিং করতে চায়। তাদের এই সোয়েটার জ্যাকেটের বাজার দেখে মন ভরে যাবে। আর ঠান্ডাটাও যা জমিয়ে অনুভব হবে যে কেনা জিনিসগুলো কাজেও লেগে যাবে। পরের রাতটাও বেশ আরাম করে লেপচাজগতেই কাটিয়ে ফেললাম আমরা।

 

পরের দিন ২৪শে ডিসেম্বর সকাল সকাল হোমস্টে ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম সুন্দর সুদূরের উদ্দেশ্যে। পথের দুইপাশে পাইনের সারি রেখে গাড়িতে লেপচাজগত থেকে মানেভন্জ্ঞনের পথ ধরলাম। মাঝে গাড়ি থামিয়ে ধোত্রে থেকে দেখা হল খুব পরিস্কার কাঞ্চনজঙ্ঘা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল শ্রীখোলা নামের এক জায়গা। সেখান অব্দিই একমাত্র গাড়ি করে যাওয়া যায়। তারপর পাহাড়ি পথ শুরু হবে শুধু পায়ে হেঁটে। যেখানে যাব সেখানে কোন যানবাহন চলে না। শ্রীখোলা নদীর কাছে গাড়িতে পৌঁছতে লেগে গেল ৪ ঘন্টা। তারপর পোর্টার কে রুকস্যাক দিয়ে, কিছু ব্যাগ নিজেরা নিয়ে আমাদের পায়ে হেঁটে ট্রেকিং শুরু হল। নির্জন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দুর্গম পায়ে চলা পথ। কখনো চরাই , কখনো উতরাই, কোথাও আবার ধস নেমে রাস্তা করুণ। কোথাও বা রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। সংকীর্ণ নির্জন পথকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে মেহগনি, শিশু, রোজউড, দেবদারু, চাপলাস, পাইন, ক্ষার, রাবার, বাঁশ এমন আরো নানা ধরণের গাছ। এই পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় তিন ঘন্টা পর পৌঁছনো হল পাহাড়ি বন্য গ্রাম টিম্বুরেতে। কী ভীষণ অপূর্ব তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পথ বিপদ-সঙ্কুল তবু অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ তারই প্রতি পদে পদে.... টিম্বুড়ে পৌঁছে পেলাম কাঠের কটেজ, কাঁসার থালায় গরম ভাত, ৩ ডিগ্রি টেম্পারেচারেও গরম ঘর, পিছনে পাহাড়ি ঝর্ণার নদী হয়ে বয়ে চলার শব্দ। খাওয়া দাওয়া সেরে টুক করে গিয়ে দেখে এলাম ঝর্ণার এলোমেলো হাঁটা চলা। খুব মিশুকে বৌদ্ধ হিন্দু ৭টা পরিবার নিয়ে এই টিম্বুড়ে গ্রাম। যেখানে একটাই মাত্র হোমস্টে গড়ে উঠেছে নাম 'স্বয়ম্ভু'। যেহেতু একটা তাই আগে থেকেই বুকিং করে যাওয়া হয়েছিল। লাকী নামের এক আঠাশ বছরের মহিলা এই লজের প্রধান। কঠিন লড়াইয়ের জীবন তাদের, চাষ বাস করে জীবন কাটে আর আমাদের মত পর্যটক ভরসা। দু'বছর হল বিদ্যুৎ ও টেলিফোন এসেছে এই গ্রামে। কিন্তু খাড়াই দূর্গম পথে ট্রান্সপোর্ট বলতে শুধু ঘোড়া আর মালবাহক পোর্টার। রাতে খেতে বসে শুনলাম তাদের জীবনের নানা কথা। ' কোন ডাক্তার হাসপাতাল কিছু নেই তাহলে মানুষ অসুস্থ হলে কী কর? ' ভাঙা হিন্দিতে জানতে চাইলাম আমি। লাকি নেপালি, যদিও হিন্দিটা লিখতে না পারলেও বোঝে। ও আমারই মত ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জানাল 'অ্যায়সে রাস্তো সে প্যায়দাল লে যাতে হ্যায়, বহত দূর যাতে যাতে যিসকি কিসমত আচ্ছে হোতে হ্যায় উও বাঁচ যাতে হ্যায়, যিসকা ন্যাহি উও ....',

২৫শে ডিসেম্বর ঘুম ভাঙল টিম্বুড়েতে। নতুন ভোরে নতুন জায়গায় বড়দিনের শুভেচ্ছা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম খাওয়া দাওয়া সেরে। লাকিকে বলে এলাম আমাদের ওখানে যেও। আমরা আবার আসলে কী আনবো জানতে চাইলাম। হাসি মুখে বললো- ' আপকে উহা সে হামারে লিয়ে মছলি লানা'। মেছো বাঙালি যদি সত্যি মাছ খাওয়াতে পারত তার থেকে বেশি খুশি আর কিছুতে হত না। কিন্তু হায়! জলের মাছকে যে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া বড় দুষ্কর। আমাদের রওনা হবার সময় হলো, ব্যাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করল টাট্টু ঘোড়া। আর আমরা হেঁটে রওনা দিলাম শ্রীখোলা। খানিক দূর এগিয়ে হাঁপিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছন ফিরে তাকালাম, দেখলাম টিম্বুড়ে গ্রাম পাহাড়ের জঙ্গলে কোথায় হারিয়ে গেছে এইটুকু সময়ের মধ্যেই। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করা ছিল গোরখে গ্রাম। সেও পায়ে হাঁটা পথ। টিম্বুড়ে থেকে গোরখে মোট ১৮ কিমি আমাদের যেতে হবে। প্রথমে আমাদের টিম্বুড়ে থেকে হেঁটে গোরখে যাওয়ার কথা ছিল। জানা গেল শ্রীখোলা থেকে রাম্মাম কম্যান্ডার গাড়ি চলাচল করে। হাঁটার কিলোমিটার খানিক কমিয়ে আনার জন্য আধ ঘণ্টা সেই প্রচন্ড দুর্গম উঁচু নিচু পথে গাড়িতেই যাওয়া হল।  হাঁটার চেয়ে গাড়ির ঝাঁকুনিতে কষ্ট যেন বেশিই ছিল। সঙ্কীর্ন পথে কে যেন খেলতে খেলতে ছোট বড় পাথর নুড়ি ছড়িয়ে দিয়ে গেছে।  তারপর রাম্মাম থেকে শুরু হল আমাদের হাঁটা গহীন অরন্য পথে পাহাড়ের গা ঘেঁষে। একদিকে উঁচু পাহাড় আর এক দিকে গভীর খাদ। পথ একটাই তাই হারানোর ভাবনা নেই কিন্তু অন্যমনস্কতায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল আছে। পথ কোথাও সরু, কোথাও ধস নেমে আছে, কোথাও বা ঝরনার জলে পিচ্ছিল। কান পাতলে গাছেদের ফিসফিস কথা বলা কানে আসছে। শুধু পাইন আর পাইন। হাঁটতে হাঁটতে কুড়িয়ে নিলাম পাইন ফুল। নানা পাখির কাকলি - নদীর কলতান - গভীর জঙ্গলে ছড়িয়ে আছে। এক অদ্ভুত কান্ড ঘটল, রাম্মাম থেকে একটা কুকুর সারা পথে গাইড করে দীর্ঘ ৪ ঘন্টা আমাদের সাথ দিল। আমরা আগু পিছু হয়ে পড়ছি সেও সমানে সকলকে আগলে নিয়ে চলেছে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় ওঠা আর নামা, ছোট সেতু দিয়ে জুড়ে আছে পাহাড়গুলো। কতগুলো পাহাড় বদলে ফেললাম গোনা হল না চলার খেয়ালে। উঠতে উঠতে যখন পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছলাম আমাদের সকল কষ্ট দূর হয়ে গেল সামান্দান ভ্যালী দেখে। চোখ মন জুড়িয়ে গেল প্রকৃতির অপরূপ মনোরম সৌন্দর্য্যে। পাহাড়ের মাথায় অপূর্ব সুন্দর ভ্যালী। ছোট্ট গ্রাম গড়ে উঠেছে, যেখানে পঁচিশ ঘর মানুষ বসবাস করে। কী যে অপূর্ব প্রকৃতির সৌন্দর্য তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। বিকাল চারটেতে সেখানে মাঠে শিশুরা খেলছে। জমি থেকে আলু তুলছে বাড়ির পুরুষ - মহিলারা। নাক দিয়ে সর্দি গড়াচ্ছে, তবুও মাটিতে থেবড়ে বসে শিশু ধুলো বালি নিয়ে খেলতে মত্ত। মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে পাইনের মাথায় মাথায়। সেখান থেকে আরো এক কিলোমিটার গিয়ে গোরখে গ্রামে আমাদের রাতের ঠিকানা আগে থেকে ঠিক করা আছে। পায়ে পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম।

 

গোরখে গ্রামের রূপেও মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এখানে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে খুব সুন্দর করে কাঠের বাড়িগুলো সাজানো। এই পাহাড়ের ধাপগুলো শীতে শুকনো ঘাসে ঢেকে আছে। ওটাই এপ্রিল-মে'তে সবুজ রঙে রাঙিয়ে থাকে। মনে হল কোন স্বপ্নের দেশে পৌঁছে গেছি। ছোট সেতু দিয়ে দুই পাহাড়কে জুড়ে দিয়ে চওড়া করে ঝর্ণা বয়ে চলেছে। জলের ধারে ধারে লাল লেজওলা হিল ফরেস্ট পাখি উড়ছে। মন জানতে চাইছিল স্বর্গ কি এর চেয়েও সুন্দর? আমরা' ইডেন' হোমস্টেতে এসে উঠলাম। এখনও অব্দি যত পাহাড়ে ঘুরেছি যত গ্রামে থেকেছি আমার দেখা এই জায়গাকেই সেরা বলা যায়। এই গ্রামে ইলেকট্রিসিটি আসেনি মোবাইলের টাওয়ারও বসেনি। সন্ধ্যায় নিস্প্রভ আলো জ্বলে জেনেরেটরে। সোলার প্যানেলও বসিয়েছে বাড়ির ছাদে। এখানে মালপত্র মানুষ নিজের ঘাড়ে পিঠে করে, নয়ত টাট্টুঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে টেনে আনে।  শহুরে সভ্য জীবন থেকে এরা অনেক দূরে, অনেক উপরে বাস করে। তাই তো এত সুন্দর। সন্ধ্যা নামতেই চারিপাশ ঘন অন্ধকারে ডুবে গেল। ঠান্ডায় কাবু হয়ে ঘরে একটু বসার উপক্রম করছি ছেলে এসে ডাকতে শুরু করলো, 'মা দেখবে চলো, তাড়াতাড়ি বাইরে চলো'। বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে অন্ধকারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললো 'মা শুধু আকাশটা দেখো'। অন্ধকার আকাশে চোখ তুলে দেখলাম আকাশে ঝকঝকে পরিষ্কার। আর তারাগুলো যেন এখানে অনেক নিচে নেমে এসে তাকিয়ে আছে জ্বলজ্বলে চোখে। না, কোন দূরবীন দরকার নেই, খালি চোখেই ভূগোল বইতে পড়া গ্যালাক্সিকে উজ্জ্বলভাবে দেখতে পাওয়া যায়। মন ভরে গেল দেখে। ছেলে অবাক হয়ে বলতে থাকলো 'পুরো জায়গাটা জুড়ে ঝোপের মতো দেখাচ্ছে, বলো মা'? ঝোপই তো, তারার ঝোপ..

 

গোরখে গ্রামটা দেখতে ঠিক যেন বেসিনের মত। এই গ্রাম ওয়াইল্ড লাইফ স্যানচুয়ারি সিঙ্গালীলা ন্যাশনাল পার্কের ভিতর। পাহাড় জঙ্গল চারিদিকে উঁচু হয়ে আছে, মাঝে নিচু হয়ে আছে এই গ্রাম। তাই এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় না। সে না যাক। এ যে নিজের রূপেই অপরূপা। আর কোন অলঙ্কারের প্রয়োজন নেই। শিলিগুড়ি থেকে ঘোড়ায় বয়ে আনে চাল - ডাল - তেল - মশলা সব। এরা নিজেরা চাষ করে ভূট্টা, মটরশুটি, আলু। জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনতে পারে না যেহেতু সংরক্ষিত এলাকা এটি, তাই এখানে কাঠটাও দুষ্প্রাপ্য । এখানে শয়নকক্ষ সস্তা কিন্তু খাদ্যদ্রব্য খুব দামী। ছত্রিশ ঘর মানুষ নিয়ে এই গ্রাম। খুব লাজুক শান্ত সরল এই পাহাড়ের মানুষেরা। সকল পাহাড়ি গ্রামের মত এখানেও সংসারের প্রধান হল নারী। তারাই দেখাশোনা করে পর্যটকদের। খুব ঠান্ডা ছিল এখানে, রাতে মাইনাস তিন ডিগ্রি টেম্পারেচার। ঠান্ডায় বালিশ বিছানা মনে হল যেন ভিজে আছে। সারারাত কুকুরগুলো চিৎকার করে দারুণ আতিথ্য করছে ভাবলাম। আসলে জঙ্গল থেকে রাতে চিতার আগমন ঘটেছিল। আমরা পরের দিন ২৬শে ডিসেম্বরটাও থেকে গেলাম গোরখেতে।

 

গোরখে গ্রামে ঢোকা বা বেরুনো সবই পায়ে হেঁটে। পরের দিন ২৭শে ডিসেম্বর গোরখে থেকে পাহাড়ি পথে হাঁটা শুরু হল। পথে শুনলাম আগের দিনই এই পথে কোলকাতার দশ জনের টিম ট্রেকিং করে যাবার সময় এক ব্যক্তি না হেঁটে ওই দুর্গম গিরিপথে ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছিলেন, আর অসুস্থ হয়ে ওখানেই খাদে পড়ে মারা যান। সেই দুশ্চিন্তায় তার সাথের গাইড মিনমা শেরপা তখনই ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার ঘরেও বউ ছেলে আছে তবু তার কাছে এই শোক যেন আরো বড়ো হয়ে গেল। এমনই হয় হয়ত পাহাড়ের মানুষ। আমাদের মত শহুরে সভ্য শিক্ষিত মানুষরা কোনদিনই যার হিসাব মিলিয়ে উঠতে পারব না। খারাপ খবর মন মুষরে দিল। ভগবান সহায় বলে হাঁটতে থাকলাম। চলতে চলতে মন ভালো করে দিল অসময়ে ফোটা রডোডেনড্রন। নানা দিক দিয়ে বয়ে চলা ঝর্ণার শব্দ যেন মনে হল - নূপুর পায়ে ছন্দে ছন্দে কেউ হেঁটে চলেছে । অচেনা পাখি গাছের ডালে ডেকেই চলেছে। সিকিমের ভারেঙে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। ভারেং ছোট্ট গ্রাম, দুদিন সব জমজমাট জীবন থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিরিবিলিতে কাটিয়ে আসার মত। শুধু পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই সময় কেটে যাবে। আমাদের এবারের মত পায়ে হেঁটে ট্রেকিং শেষ...  গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলাম। পরবর্তী গন্তব্যস্থল ঠিক করা ছিল সিকিমের পেলিং। যেতে যেতে বিকালে অন্ধকার হওয়ার মুখে দেখলাম এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম সেতু সিংসোর ব্রিজ। বুঝলাম পশ্চিম সিকিমের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।

 

বেশ কটা দিন পাহাড়ের গ্রাম্য শান্ত নিরিবিলি মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকার পর পেলিং এর মতো উন্নত শহরে এসে কিছুতেই সেই আনন্দটা মনের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তার উপর পরের দিন ২৮শে ডিসেম্বর ভোরে উঠে দেখলাম আকাশও মুখ ভার করে আছে। ঘর থেকে যেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাওয়ার কথা সেও মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে। এসেছি তাই গাড়িতে করে পেলিংয়ের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে গেলাম। পরপর দেখলাম রিম্বি ফল্স, কাঞ্চনজঙ্ঘা ফল্স, রক গার্ডেন বা অরেন্জ ভিলেজ যেখানে অজস্র কমলালেবু গাছে ফল ধরে আছে, ভিতরে নদীও বইছে নিজের খেয়ালে। তারপর দেখলাম খেচিপুরি লেক, এটি এখানে একটি পবিত্র স্থান হিসেবে মানা হয় প্রচলিত আছে। এখানে দাঁড়িয়ে কোন কিছু চাইলে তা পূরণ হয় তাই একে উইশিং লেক বা বাংলায় ইচ্ছেনদী বলে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে গেলাম স্কাইওয়াক দেখতে। আমাদের জন্য বিস্ময়কর কিছু যে অপেক্ষা করে আছে তা ঘুনাক্ষরেও আগে টের পাই নি। স্কাইওয়াকটা বিশাল উঁচু পাহাড়ের উপর সম্পূর্ণ কাঁচের পথ চলার জায়গা। এটিও এক চীনে আছে আর দ্বিতীয় এই ভারতবর্ষের সিকিমে। বিরাট বুদ্ধ মূর্তি অনেক উপরে বসে সর্বক্ষণ আশীর্বাদ দিচ্ছেন। ওখানে পৌঁছেই মেঘের ওড়না সরিয়ে উঁকি দিল কাঞ্চনজঙ্ঘা আর শুরু হল স্নো ফল। দীর্ঘ উনিশ বছর পর পেলিংয়ে এমন স্নো পড়লো। ওখানকার সকলের মুখেই সে কথা শুনলাম। আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলাম।

 

পেলিং থেকে পরের দিন ২৯শে ডিসেম্বর যাওয়া হল দক্ষিণ সিকিমের রাভাংলা। রাভাংলা জায়গাটাও বেশ ভালো লাগল। সেখানে বুদ্ধ পার্ক খুব সুন্দর জায়গা। বুদ্ধের জীবন কর্ম সাধনার সকল কথা হাতে আঁকা ছবিতে ছবিতে সাজানো আছে, তিন তলা অব্দি। আবার বাইরের দিকে এই উঁচু স্থানের উপর বিরাট বুদ্ধ মূর্তি। আগের দিন প্রচুর বরফ পড়ায় চারিদিকে বরফ জমে আছে, আকাশ ঘন নীল। দূরে প্রাণ খুলে হাসি ছড়াচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। রাভাংলায় ঠান্ডা মাইনাস আট দেখেছিলাম শুতে যাবার আগে পর্যন্ত। আর নেবার ক্ষমতা ছিল না তাই চুপচাপ চাপাচুপি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

 

পরের দিন ৩০শে ডিসেম্বর ঘুম থেকে উঠে শুনলাম আমাদের যে নামচি দেখতে যাবার কথা ছিল তা আর হবে না। পথে প্রচুর বরফ জমে তাই গাড়ি যাবে না। এবার ঘরে ফেরার পালা, শুধু নেমে আসার বেলা। টিকিট কাটা ছিল রাতের পদাতিক এক্সপ্রেসে।

পাহাড়ের সঙ্গ ছাড়তে ছাড়তে মনে গান ভেসে এলো —

'আমার তো গল্প বলা কাজ, নটে গাছ মুড়িয়েছে আজ

এবার ফিরি তবে পাহাড়ের ঢাল গুনে গুনে,

কাঁটা কাঁটা ঘসে ঘসে উলে উলে বুনে বুনে।

সব তো বলা যায় না মুখ ফুটে,

আসলে গল্প বলে ঠোঁটই অস্ফুটে

ঘুড়ির ঠিকানা জানে গাছের মাথায় কাটা সুতো

আমার ফেরার পথ আরো যদি মেঘে ঢেকে যেত'........

Redirect to Address page

Updating Subscription details

Redirecting...Please Wait