পৌরাণিক বড়গল্প - রাজেন্দ্রনন্দিনী

পৌরাণিক বড়গল্প - রাজেন্দ্রনন্দিনী

রাজেন্দ্রনন্দিনী
শাওনা চক্রবর্ত্তী ঘোষ

 

                                                                                              ১.

দ্বাদশ বর্ষব্যাপী ভারত পরিভ্রমণে বেরিয়েছেন তৃতীয় পাণ্ডব। সঙ্গী শুধু গাণ্ডীব ধনুক, অক্ষয় তুণীর এবং গেরুয়া বসন। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজকুমার আজ পথে নেমেছেন। দ্বাদশ বর্ষ ধরে এক কঠিন ব্রত পালন করতে হবে তাঁকে, তাই এই বেশ।

এই তপশ্চর্যার আড়ালে আছে এক নির্মম সত্য। দ্রুপদকন্যার সাথে বিবাহকালে তাঁরা পাঁচ ভাই এক কঠিন নিয়মের বাঁধনে নিজেদের বেঁধেছিলেন। তা হল, পাঞ্চালি যখন পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে কোনো একজনের ঘরণী থাকবেন, তখন সেই ভ্রাতার মহলে অন্য চার ভ্রাতার প্রবেশ থাকবে নিষিদ্ধ। সেই মহলে ভুলবশত অন্য কোনো ভ্রাতা যদি ঢুকে আসেন, তাহলে তাঁর বারো বৎসর নির্বাসন দন্ড হবে। রাষ্ট্রের এক বিপদের মুহূর্তে অর্জুনের মনে হয়নি নিজের স্বার্থরক্ষার কথা, বড় ভাই যুধিষ্ঠিরের ঘরণী পাঞ্চালীর গৃহে তিনি প্রবেশ করেন গাণ্ডীব নিতে, ফলত যুদ্ধে জয়লাভ করলেও সেই দন্ড তাঁকে মাথা পেতে মেনে নিতে হয়। তিনি সত্যাশ্রয়ী অর্জুন, সবার কাকুতি মিনতি উপেক্ষা করে চললেন নির্বাসনে, খুলে ফেললেন মহামূল্যবান আভরণ, পরে নিলেন সাধারণ বসন। মন্ত্রদীক্ষা নিলেন আজীবনের সুহৃদ মাধবের কাছ থেকে। তিনি বললেন, 'হে অর্জুন! এ সুযোগ হেলায় হারিয়ে ফেল না। অদূরে ধর্মযুদ্ধ আসন্ন। এই সুযোগে যেন-তেন-প্রকারেণ ভারতবর্ষের তাবড় নৃপতিদের সাথে সন্ধিতে আবদ্ধ হও। সুযোগ পেলে তাঁদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনেও পিছপা হয়ো না। তুমি বুঝতে পারছ তো আমি কি বলতে চাইছি?'

ADVERTISEMENT
Swades Times Book

-'বৈবাহিক সম্পর্ক? তা কিকরে সম্ভব মাধব? আমি যে পরিব্রাজকের বেশ ধারণ করেছি!'--অর্জুন বিস্মিত।

মুখে অপার্থিব হাসির রেখা টেনে শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দেন, -'তুমি প্রায়শ্চিত্ত হেতু এই বেশ ধারণ করেছ পার্থ, তুমি সন্ন্যাসী নও। যিনি সমস্ত কামনা বাসনা পরিত্যাগ করেছেন, তিনিই সন্ন্যাসী। তুমি ক্ষত্রিয়, একথা ভুলে যেও না। কিন্তু তোমাকে যে এক যুগপরিবর্তনের কারিগর হতে হবে, কেননা ধর্মযুদ্ধ আসন্ন। তাকে ঠেকাবার ক্ষমতা কারো নেই। ধর্মের জয় অবশ্যম্ভবী। আর তোমার পক্ষে যুদ্ধে জয়লাভ করতে গেলে তা বিভিন্ন রাজপরিবারের সাথে সন্ধি ছাড়া তো সম্ভব নয়। কোনো সুযোগ হাতছাড়া কোরো না, দ্বাদশ বর্ষ পরে তুমি যখন ফিরে আসবে, তখন খালি হাতে নয়, নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হারানো অধিকার ফেরৎ পাওয়ার যোগ্য জবাব নিয়ে ফিরো।'

-'বুঝেছি মাধব। তোমার কথা, সে তো আজ্ঞা। বোঝার মত কিছু নেই এতে, তুমি যখন বলেছ, তখন সে আদেশ শিরোধার্য।'

নানা দেশ ভ্রমণ করে অর্জুন এসেছেন মণিপুর রাজ্যে। শ্রান্ত, ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। একটি সরোবর তাঁর দৃষ্টিগোচর হল, আশেপাশে অনেক সুমিষ্ট ফলের গাছ। স্নান করে ফলাহার করবেন, এই বাসনা নিয়ে সরোবরে অবগাহন করলেন। গাণ্ডীব রেখে দিলেন নিকটবর্তী এক তরুতলে, মনের সুখে স্নান করছেন, স্নান শেষে করবেন জপ আহ্নিক। হঠাৎ কিসের যেন শোরগোল! চোখ মেলে দেখলেন একটি বালকের দল নিবিষ্ট মনে তাঁর গাণ্ডীব ধনুক আর অক্ষয় তুণীরের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করছে, হাত দিতে চাইছে। অর্জুনের দৃষ্টি তাদের দিকে পড়তেই ওই অক্ষয় তুণীর থেকে
কয়েকটি বাণ নিয়ে তারা ছুট লাগাল। অর্জুন তাদের পিছন পিছন ধাওয়া করলেন। ওই বালকের দল জানেনা যে বাণ তারা নিয়ে ছুট লাগিয়েছে তা খেলার সামগ্রী নয়। কিছুদূর ছুটে বালকের দল কাকে দেখে যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্যদিক থেকে ছুটে আসছেন এক অশ্বারোহী। সেই ব্যক্তিকে দেখে বালকের দল আভূমিপ্রণত হল। ক্ষীপ্র হাতে অর্জুনের বাণগুলি তাদের হাত থেকে নিয়ে অশ্বারোহী পুরুষ অর্জুনকে ফেরৎ দিলেন। তাঁর মুখটি বস্ত্র দ্বারা আবৃত হলেও আগন্তুককে কোনো পুরুষ বলে মনে হচ্ছে না অর্জুনের। তিনি বললেন, -'ভদ্র! আমার উপকার করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। বিশেষত ওই বালকের দলের বিপদ হতে পারত বাণগুলি নিয়ে খেলতে গিয়ে। কিন্তু, কে আপনি? আমি আপনার পরিচয় জানতে ইচ্ছুক!'

-'আমি? আমি এই রাজ্যের এক সাধারণ নাগরিক।'

অর্জুন বিস্মিত! জহুরীর চোখ তাঁর। আগন্তুকের ঘোড়সওয়ারী, তাঁর কণ্ঠ, আপাতগাম্ভীর্য, রাজকীয় চলন এবং ক্ষীপ্র গতি দেখেই তাঁর মনে হয়েছে, ইনি কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। এবং ইনি একজন মহিলা। কিন্তু বিনয় এমনই এক অলংকার, যা মহৎ মানুষকেই শোভা পায়। ইনিও বিনয়ই করছেন। যাক, তাহলে এই দেশে মহিলারাও দেখিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা পুরুষদের থেকে কোনো অংশে কম নন। এই তো চাই! আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেন তৃতীয় পাণ্ডব।

আগন্তুক বললেন, -'আপনি এই স্থানে কিভাবে? এই বাণ, এই ধনুক তো কোনো সাধারণ ব্যক্তির নয়!'

-'আমি অর্জুন। ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে আসছি। বিশেষ কারণে ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করতে করতে আপনাদের রাজ্যে এসে উপস্থিত হয়েছি।'

আর কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের বীরত্বের কাহিনী কারো অজানা নয়। আগন্তুক বললেন, 'এই স্থান আপনার নয় কুমার। আপনি আমাদের রাজপ্রাসাদে আতিথ্য গ্রহণ করলে রাজাধিরাজ ধন্য মনে করবেন নিজেকে।' এককথায় আগন্তুক রাজমহলে রাজঅতিথি হওয়ার পরামর্শ দিলেন অর্জুনকে।

-'আপনি এই প্রস্তাবে সম্মত হলে রাজাধিরাজ যারপরনাই আনন্দিত হবেন কুমার।'

-'আপনি মহারাজকে বলবেন, অর্জুনের রাজপ্রাসাদে থাকার অনুমতি নেই। রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে এসেছি, তাই আমার পক্ষে গৃহস্থের আমন্ত্রণ রক্ষা করা অনুচিত। তবে যদি নগরীর মধ্যে কোথাও একটু বসবাস করার অনুমতি পাই, যদি একটি কুটির রচনা করতে পারি, তাতেই ধন্য হব। এই জায়গায় কয়েকমাস থাকার প্রয়োজন, আর তাই....'

-'বুঝতে পারছি, আপনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমি রাজাধিরাজকে জানাব আপনার কথা। এই রাজ্যে স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার অধিকার প্রত্যেকের আছে। সেই অধিকারে আপনাকে পরামর্শ দেব, এই সরোবরতীরে আপনি কুটির রচনা করে থাকতে পারেন।'

-'আপনি আমাকে ঋণী করলেন ভদ্রে ।'

কয়েকদিন পরের কথা। নবনির্মিত পর্ণকুটিরের সামনে মণিপুররাজ চিত্রবাহনের সওয়ারী এসে উপস্থিত হল। তিনি অর্জুনের আগমন সংবাদ জেনে নিজে এসেছেন তাঁর সাথে দেখা করতে। মন্ত্রী অমাত্যসহ বিশাল একটি দল নিয়ে রাজা এসেছেন। এসেছেন অর্জুনকে প্রাসাদে নিয়ে যেতে। তিনি অর্জুনের সান্নিধ্য চান, সে কথা জানালেন। কিন্তু অর্জুনের অপারগতার কথা জেনে বুঝলেন, অর্জুনের রাজপ্রাসাদে দিনযাপন করার সত্যিই অসুবিধা রয়েছে।

-'দয়া করে এ রাজ্যে যখন এসেই পড়েছেন, আমাদের অন্তত কিছু করার সুযোগটুকু দিন। আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আমাদের কাছে বরণীয়। আপনার সখা বাসুদেবের কথা আর কি বলব, সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ কখনো হয় নি কিন্তু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি কবে তাঁর দর্শন পাব। আপনার জ্যেষ্ঠের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী আমরা। এই অবস্থায় আপনি রাজআতিথ্য গ্রহণে অপারগ। বুঝি বা আমাদের মনের আকাঙ্খা মনেই রয়ে গেল।'--তীব্র হতাশা মনিপুর রাজের কণ্ঠে।

-'কখনোই তা নয় মহারাজ। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমরাও বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনেই উৎসাহী, শত্রুতা আমার জ্যেষ্ঠের ধর্ম নয়। স্বয়ং বাসুদেবের বার্তাবাহী আমি, তাঁর এক সামান্য ভৃত্য বলা চলে। তাঁর আদেশেই আমার ভারতবর্ষ পরিক্রমায় বেরোনো।'

-'বাহ্ বাহ্! বাসুদেবকে আমার প্রণাম। কিন্তু আফসোস একটাই, আপনি আমাকে সেবা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করলেন।'

-'আপনি আমায় অপরাধী করবেন না মহারাজ। আদেশ করুন আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?'

-'অভয় যখন দিলেন তখন বলি, আমাদের এক পূর্বপুরুষ একসময় ভগবান পিনাকপাণির দর্শন লাভের জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় প্রীত হয়ে মহাদেব তাঁকে এক আশ্চর্য বর দেন। সেই বরের বলে আমাদের বংশে শুধুমাত্র পুত্রই জন্মায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যতিক্রম হল যখন আমার গৃহিণীর কোল আলো করে এক কন্যাসন্তান জন্ম নিল। সে জন্য আমি বিমর্ষ হয়ে পড়িনি কখনো, বরং মহাদেবের লীলাকে সানন্দে স্বীকার করে নিয়ে সেই কন্যাকে পুত্ররূপে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। তাঁর নাম চিত্রাঙ্গদা। তিনি বিবিধ শস্ত্রবিদ্যায় দক্ষ, নানা শাস্ত্রে পারঙ্গম। তিনি এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারিণী। তাঁর হাতেই এই রাজ্যের নিরাপত্তার ভার ন্যস্ত করে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই। তাঁর বিবাহের পরেও তাঁকেই এই রাজ্য দেখাশোনা করতে হবে। এখন মনে বাসনা, যদি আপনি দয়া করে তাঁর শস্ত্রশিক্ষার ত্রুটিবিচ্যুতি সম্বন্ধে তাঁকে অবহিত করেন, এক কথায় যে কয়দিন এখানে বাস করবেন, ততদিনে যদি আমার কন্যা গুরু হিসাবে আপনার সান্নিধ্য লাভ করতে পারে, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব। রাজ্য শাসন করতে গেলে উপযুক্ত যোদ্ধা হিসাবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।'

-'আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, রাজকুমারীকে আপনি সুযোগ্য করেই তৈরী করেছেন। আপনার এই অনুরোধ আমি আদেশ হিসাবেই নিলাম। কাল প্রাতকাল থেকেই তবে অভ্যাস শুরু করা যাক। তবে একটা কথা, আপনার এই প্রস্তাবে রাজকুমারীর গুরু মনক্ষুন্ন হবেন না তো?'

-'তার প্রশ্নই নেই। রাজকুমারীর শস্ত্রশিক্ষা স্বয়ং আমার কাছেই।'

-'তবে তো আর কোনো অসুবিধার প্রশ্নই নেই। আপনার প্রস্তাব আমি সানন্দে স্বীকার করলাম।'

খুশিমনে রাজা বিদায় নিলেন। সুখবরটা রাজকুমারীকে জানাতে হবে। তাঁর অপার সৌভাগ্য, যে তিনি অর্জুনকে গুরু হিসাবে পাবেন।

                                                                                              ২.

সেদিন বিকেলবেলা অর্জুন ধনুর্বিদ্যা অভ্যাস করছিলেন। কিন্তু কেবলই যেন তাঁর মনে হতে লাগল যে একজোড়া চোখ যেন তাঁকে লক্ষ্য করছে। তাঁকে সতর্ক থাকতে হবে! শত্রুর তো তাঁর অভাব নেই। দুর্যোধন নিশ্চই কোনো চর লাগিয়েছে। কিন্তু তিনিও অর্জুন! যে টক্কর নিতে আসবে তার মৃত্যু অবধারিত। সতর্ক অর্জুন গাণ্ডীবে বাণ যোজনা করলেন। তিনি শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপে দক্ষ। সেই বাণ তিনি নিক্ষেপ করতে যাবেন, এমন সময়ে অন্য দিক থেকে একটি বাণ এসে তাঁর হাতের বাণটিকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। পরমুহূর্তেই একটি বাণ এসে অর্জুনের পদতলে নিক্ষিপ্ত হল। অর্জুন বুঝলেন, অন্তরালে থাকা ব্যক্তি শত্রু নন। তাহলে কে তিনি? একটু এগিয়ে গিয়ে গতদিবসের সেই যোদ্ধাকে খুঁজে পেলেন।

-'আপনি? আপনি এখানে এই সময়ে?'

-'আপনার শস্ত্রচালনা লক্ষ্য করছিলাম! আমার পিতা আমাকে আপনার হাতে সপে দিয়েছেন শুনেছি, আপনি আমার শস্ত্রগুরু।'

-'কে আপনি?'

এইবার যোদ্ধা তাঁর অবগুন্ঠন উন্মোচন করেন। বলেন, 'আমি চিত্রাঙ্গদা।'

অর্জুন বিস্ময়ে হতবাক। তাঁর মানে এই মহিলাই রাজকুমারী! ঈষৎ শ্যামাঙ্গী, কিন্তু তেজোদৃপ্ত মুখমন্ডল এবং আয়ত চক্ষু দু'টি থেকে শৌর্য ঝরে পড়ছে। কিন্তু পূর্বে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। যোদ্ধা সর্বস্থানে নিজের আসল পরিচয় দেন না। বাহবা! কিন্তু এঁকে তিনি কি আর শেখাবেন? যিনি অর্জুনের হাতের বাণকে উড়িয়ে দিতে পারেন নিজের বাণের দ্বারা, তিনি তো নিজেই এক মহাযোদ্ধা। কয়জনের এ হেন ক্ষমতা আছে? তবুও, ভুয়সী প্রশংসা তিনি এখন করবেন না। দেখা যাক।

-'আপনি কি আমাকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করবেন কুমার?'

-'আমার ভাল লাগবে আপনাকে শেখাতে। আপনি সবদিক দিয়ে যোগ্য রাজকুমারী।'

-'ধন্যবাদ। কাল প্রাতে দেখা হবে তাহলে।'-এই বলে রাজকুমারী ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে মিলিয়ে যান।

পরেরদিন প্রাতকালে অর্জুনের কুটিরের সামনে মহারাজের আগমন হল, সাথে একজন মহিলা। কিন্তু ইনি কে? ইনিই কি যোদ্ধার বেশে অর্জুনের সাথে আলাপ হওয়া সেই চিত্রাঙ্গদা? নাকি অন্য কেউ? আড়ষ্ট পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন কুটিরের দিকে। পরণের শাড়ি তো বারকয়েক তাঁর পায়ে জড়িয়েই গেল। বোঝাই যায় শাড়ি পরায় অনভ্যস্ত তিনি। হয়ত বা সনাতন ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্যই তাঁকে অর্জুনের সামনে এই বেশে আসতে বলা হয়েছে।

অর্জুনের সাথে মহারাজ আলাপ করিয়ে দিলেন তাঁর কন্যার। কিন্তু অর্জুন বলে উঠলেন, -'কেন এই প্রয়াস রাজকুমারী? কেন এই বেশ?'

-'আজ রাজকুমারীর সাথে আপনার প্রথম সাক্ষাৎ, উনি তো ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজকুমারীদের মত সাজগোজ করতে জানেন না, শেখেন নি কখনো। ওঁর এক সখী এইভাবে ওঁকে সাজিয়ে দিয়েছে। আমিই বলেছি। আপনি যদি ওঁর এই প্রয়াসকে ক্ষমার চোখে দেখেন তাহলে....'

উত্তরটা অর্জুন দিলেন। -'রাজকুমারী, আপনি অপরূপা আপনার বীরত্বে, আপনার সৌন্দর্য আপনার শস্ত্রদক্ষতায়, যা একবার দেখেই বুঝেছি আমি। অর্জুনকে টক্কর দিয়েছেন আপনি। তবে কেন নিজেকে চিরন্তন নারীত্বের অবগুন্ঠনে লুকোনোর এই ব্যর্থ প্রয়াস? কেন চোখে কাজল? হাতে গলায় কেন এত অলংকার? এ বেশ আপনার নয়! যান, নিকটবর্তী ওই সরোবরে গিয়ে নিজের চন্দনচর্চিত মুখমন্ডল ধুয়ে আসুন, তুলে ফেলুন চোখের কাজল, কুটিরে গিয়ে বদলে ফেলুন এই শাড়ি। যোদ্ধাবেশে আসুন। আর কখনো নিজের আত্মস্বরূপকে লুকোনোর এই হীন প্রয়াস করতে আপনাকে যেন না দেখি।'-খানিক তিরস্কার যেন অর্জুনের কণ্ঠে। কয়েকমুহূর্ত পরে চিত্রাঙ্গদা দেখা দিলেন তাঁর সহজাত রূপে, যোদ্ধার বেশে।

'আজ অর্জুনের কাছে আপনার অভিষেক, আশীর্বাদ করি আপনি আরো বড় যোদ্ধা হয়ে উঠুন।'--অর্জুন তীরের ফলায় নিজের আঙুল থেকে বেরিয়ে আসা রক্ততিলক পরিয়ে দিলেন চিত্রাঙ্গদার কপালে। শুরু হল শস্ত্রশিক্ষা।

যত দিন অতিবাহিত হতে লাগল, অর্জুন এক নতুন চিত্রাঙ্গদা কে আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। বাণ এবং তরবারি চালনায় ক্ষীপ্র থেকে ক্ষীপ্রতর, দক্ষ থেকে অতিদক্ষ হয়ে উঠতে লাগলেন রাজকুমারী। অর্জুনকেও স্থানবিশেষে একটু অবাক হতে বাধ্য করছেন তিনি। অর্জুন পাঞ্চালিকে দেখেছেন, দেখেছেন উলুপীকে, তাঁরাও শস্ত্রচালনায় দক্ষ, কিন্তু তা নিজের আত্মরক্ষার্থে। এই প্রথম কাউকে দেখলেন যাঁর মধ্যে প্রজাদের রক্ষা করার মত শক্তি এবং ক্ষমতা বিদ্যমান।

কিন্তু এই কয়েকমাসে চিত্রাঙ্গদাও যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন প্রতিনিয়ত। নিজেকে এতটা পূর্ণ তাঁর লাগেনি কোনোদিন। অভ্যাস শেষ করে এসে প্রতিদিন প্রাসাদে নিভৃতে বসে কি যেন ভাবেন। নারীসুলভ আবভাব তাঁর আসেনা কোনোদিনই, কিন্তু নিজের হৃদয়ের গহীন গোপনে যে নারী মনন, তাকে তিনি লুকোবেন কিভাবে? প্ৰিয় সখীর চোখে ধরা পড়ে গেলেন একদিন।

-'কি ব্যাপার সখী, তোকে বিচলিত মনে হচ্ছে। কয়েকদিনই দেখছি, কার কথা যেন ভাবছিস। মনে হচ্ছে, এতদিন পর আমাদের রাজকুমারীর কাউকে মনে ধরেছে? কে তিনি? কোনো রাজ্যের রাজা? রাজকুমার? নাকি নগরীরই কোনো...'

-'তুই থামবি উপাসনা? সেসব কিছুই নয়।'

-'সেসব কিছুই নয়? তাহলে আমার সখীর মুখে এই লাল রঙের ছটা কিসের? সখী তো আমাদের মত প্রসাধনী ব্যবহার করেনি কোনোদিন। বল না সখী, কি তাঁর নাম? কে তিনি, যিনি রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদার মন হরণ করেছেন? যদিও আমি একটু একটু বুঝেছি, কিন্তু ভয় হয়, সে কথা বললে সখী আমার প্রাণহরণ না করে নেন!'--খিলখিল করে হেসে ওঠে রাজকুমারীর প্ৰিয় সখী উপাসনা।

রাজকুমারী নিজের স্বভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখেন। বলেন না কিছু। উপাসনার চোখ এড়ায় নি, তিনি চিত্রাঙ্গদার মনটিকে সত্যিই হরণ করেছেন। একসাথে থাকতে থাকতে কখন যে রাজকুমারী তাঁকে নিজের মন দিয়ে ফেলেছেন, তা নিজেই বুঝতে পারেন নি। যদিও প্রেম নিবেদন করার ভাষা রাজকুমারীর জানা নেই, কিভাবে মনের কথা মনের মানুষকে জানাতে হয় তাও তাঁর অজানা, তবুও, মন কবে কারো বশে থেকেছে? রাজকুমারীও একজনকে নিজের মন দিয়ে ফেলেছেন বৈকি।

ইতিমধ্যে মণিপুর রাজ অর্জুনের সম্মানার্থে বিবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। যার মধ্যে মল্লযুদ্ধ, তিরন্দাজি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি অনেক কিছুই ছিল। এছাড়াও ছিল শিকারের ব্যবস্থা। এ কথা সবারই জানা, যে অর্জুন শুধু শস্ত্রচালনাতেই দক্ষ তাই নয়, উনি সঙ্গীত এবং নৃত্যকলাতেও সবিশেষ পারঙ্গম। সেইজন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছিলেন মণিপুর রাজ। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে যে স্বয়ং অর্জুন বীণাবাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন, তা রাজকুমারীর জানা ছিল না। অর্জুনের বীণাবাদন শুনে মনে হতে লাগল যেন স্বর্গের কোনো দেবতা বোধহয় আবির্ভূত হয়েছেন।

বাদ্যযন্ত্র ধীরে ধীরে থেমে গেল। কিন্তু সেই অপূর্ব রেশ শ্রোতাদের মনে রয়ে গেল বহুক্ষণ। অর্জুন মঞ্চ থেকে নেমে চিত্রাঙ্গদাকে শুধোলেন, -'কেমন লাগল আমার হাতে বীণার সুর, বললেন না তো রাজকুমারী?'

-'অপূর্ব, অদ্ভূত, অনবদ্য! এছাড়া আর কোনো শব্দ আমার অভিধানে নেই। ছোট থেকে কেবলই শস্ত্রবিদ্যা শিখে বড় হলাম, আজ মনে হচ্ছে যদি আপনার মত বীণা বাজাতে পারতাম! আপনি আমাকে শেখাবেন কুমার?'

-'না, শেখাব না।'--গুরুগম্ভীর কণ্ঠ অর্জুনের।

-'কেন? আমি কি একেবারেই অযোগ্য?'--চিত্রাঙ্গদার কণ্ঠে সংশয়।

-'তা নয়। তবে আমি যখন আপনাকে শস্ত্রশিক্ষা অভ্যাস করাই, তখন আপনি আমাকে গুরু মানতেই পারেন। কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে আপনার গুরু হয়ে থাকার কোনো বাসনা আমার নেই। সঙ্গীত শিখতে গেলে আগে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা জরুরী। তা না হলে শিক্ষা শুকনো কাঠের মত নিরস হয়ে যায়। তা থেকে স্রোত নির্গত হয় না।আপনাদের রাজ্যে সঙ্গীতশিল্পী বা বাদ্যশিল্পীর অভাব হয়ত নেই। তাঁদের কাউকে গুরু মেনে আপনি বীণাবাদন শিখে নিতে পারেন।'--সহাস্য কণ্ঠস্বরে অর্জুন  বলে ওঠেন।

তাহলে কি অর্জুনের প্রতি রাজকুমারীর মনোভাব শুধুই তাঁর একার দিক থেকে নয়? ওদিক থেকেও কি একইরকম ইঙ্গিত? অন্তত রাজকুমার অর্জুনের বলা কথাগুলি সেই ইঙ্গিতই বহন করছে যেন।

                                                                                                     ৩.

-'রাজকুমারী, বিগত কয়েক মাসে আপনাকে যা যা শেখাতে পেরেছি, যে ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে আপনি মুক্ত হয়েছেন, তার একটা পরীক্ষা নেওয়া যাক এবার। আপনার পিতা আমার হাতে আপনাকে অর্পণ করেছিলেন, তাঁর কাছেও আমি দায়বদ্ধ। দেখা যাক তাঁর ইচ্ছা আমরা পূর্ণ করতে পারলাম কিনা।'

-'আপনার যা আজ্ঞা গুরুদেব।'-কপালে জমে থাকা স্বেদবিন্দু মস্তকবন্ধনী দিয়ে মুছে নেন চিত্রাঙ্গদা।

-'তবে ঠিক আছে। আগামীকাল দ্বিপ্রহরে আপনার পরীক্ষা।'

-'আগামীকাল?'

-'কেন? আপনি কি প্রস্তুত নন? আমার যে হাতে সময় নেই রাজকুমারী? অনেকদিন হল এখানে আছি, এইবার তো আবার পথে বেরোতে হবে। তার আগে আপনার পরীক্ষা নিতে চাই।'

-'আপনি চলে যাবেন? কিন্তু গুরুদক্ষিণা না দিলে তো শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। আপনাকে কি গুরুদক্ষিণা আমি দিতে পারি?'

-'গুরুদক্ষিণা?'--হাহা করে হেসে উঠলেন অর্জুন। -'নিশ্চই। সে তো দিতেই হবে। আগে আপনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবে সে প্রশ্ন। কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে যা চাইব তা আপনি দিতে পারবেন কিনা?'

-'কি চাইবেন রাজকুমার?'--এই প্রথম রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদার মুখে এক আরক্তিম আভা খেলা করে যায়।

-'যা চাইব তা আপনার আয়ত্তেরই মধ্যে। সে কথা পরে হবে। এখনই সন্ধ্যা নামবে। আপনার প্রাসাদের দিকে প্রস্থান করা উচিৎ।'

মৃদু হেসে রাজকুমারী বললেন, 'সাধ্যের মধ্যে থাকলে আপনার গুরুদক্ষিণা আমি  দিতে পিছপা হব না।'-- এই কথা বলে প্রতিদিনের মত অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে রাজকুমারী প্রাসাদে ফিরলেন।

পরের দিন রাজকুমারীর শস্ত্রপরীক্ষা, তোড়জোড় সম্পূর্ণ। পরীক্ষার তিনটি স্তর। প্রথম স্তরে সমান্তরাল রেখায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি বৃক্ষের মধ্যে দিয়ে বাণ চালনা করে একবারেই লক্ষ্যভেদ করতে হবে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে দ্বিতীয় স্তরে চোখ বন্ধ রেখে একটি কাঠের পুতুলের মাথায় রাখা একটি ফলকে বাণের সাহায্যে সমান চারভাগে বিভক্ত করতে হবে। এই দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত স্তরে শব্দভেদী বাণের সাহায্যে একটি কাঠ দ্বারা নির্মিত পশুর অবস্থান চিহ্নিত করে চোখ বাঁধা অবস্থায় বিদ্ধ করতে হবে।

রাজকুমারী প্রস্তুত। অর্জুন এসে উপস্থিত হয়েছেন। আছেন নগরের নানা গণ্যমান্য ব্যক্তি, মন্ত্রী, অমাত্য। নারী পুরুষ নির্বিশেষে নগরের সাধারণ মানুষেরা আছেন।

প্রবল করতালির মধ্যে দিয়ে রাজকুমারীকে স্বাগত জানাল উপস্থিত জনতা। রাজকুমারী তাঁর প্রথম শস্ত্রশিক্ষাগুরুর আশীর্বাদ নিলেন। তিনি আর কেউ নন, মণিপুর রাজ চিত্রবাহন স্বয়ং। রাজকুমারী আশীর্বাদ নিলেন অর্জুনেরও।

-'বিজয়ী ভব।'

রাজকুমারী এগিয়ে চললেন পরীক্ষাস্থলের দিকে। প্রথম পরীক্ষায় রাজকুমারীর দৈহিক শক্তিরও পরীক্ষা। কেননা একটি বাণের দ্বারা তিনটি বৃক্ষকে ভেদ করতে গেলে অনন্য দৈহিক শক্তি প্রয়োজন। রাজকুমারী সফল হলেন। দ্বিতীয়টিতে ধৈর্যের পরীক্ষা। কেননা ওই কাঠের পুতুলটিকে আসল মানুষ ভেবে নিয়েই এতো সুক্ষভাবে তার মাথার ওপর রাখা ফলটিকে বিভক্ত করতে হবে, যাতে সেটি চূর্ণবিচূর্ণ না হয়ে সমান চারভাগে ভাগ হয়। রাজকুমারী কি পারবেন? সবাই উৎকন্ঠিত!

রাজকুমারী পারলেন। তাঁর বাণ তাঁর পরিচয় বহন করেছে। অর্জুন বিস্মিত এবং আনন্দিত। এই পরীক্ষায় সফল হওয়া এত সহজ ছিল না। বাণের আঘাতে কাঠের পুতুলটি পড়ে গেল না, কিন্তু ফলটি বিভক্ত হল। ঠিক যেমনটি অর্জুন চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সন্দেহ ছিল রাজকুমারী এই পুতুলটিকে স্থির রাখতে পারবেন কিনা! তিনি পেরেছেন। অর্জুনের চোখে তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে সারথিপুত্র বসুষেন বা তাঁর শ্যালক ধৃষ্টদ্যুম্ন ছাড়া এত সাবলীলভাবে এই কাজটি কারো পক্ষে করা সম্ভব কিনা তিনি জানতেন না।

তৃতীয় পরীক্ষার সময় আগত। রাজকুমারীর চোখ বাঁধা। কাঠ দ্বারা নির্মিত পশুটিকে একটি এমন শকটের ওপরে রাখা হয়েছে, যার তলায় চাকা লাগান আছে। সেই যন্ত্রচালিত যানের সাহায্যে পশুটি বিভিন্ন দিকে ঘুরে চলেছে এবং তার গলায় বাঁধা ঘন্টাটি তার দিক নির্ণয় করছে। রাজকুমারী অপেক্ষা করছেন অর্জুনের নির্দেশের। এই পরীক্ষা রাজকুমারীর স্থির বুদ্ধির। যাতে একজনের জন্য রাখা বাণ অন্য কারো শরীরে নয়, লক্ষ্যের শরীরেই প্রবেশ করে। অর্জুন মূল মঞ্চের পাশে রাখা বৃহৎ ঘন্টাটিতে হাতুড়ি দ্বারা আঘাত করে জানান দিলেন, সময় হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারীর ধনুক থেকে একটি বাণ নির্গত হয়ে পশুটিকে বিদ্ধ করল। উত্তেজিত জনতার করতালিতে কান পাতা দায়। রাজকুমারী চোখের বাঁধন খুলে ফেললেন। প্রথমেই তাঁর চোখ গেল মঞ্চের ওপর দন্ডায়মান অর্জুনের দিকে। চিত্রাঙ্গদা দেখলেন, তাঁর মুখে স্মিত হাসি।

অসম্ভব শৌর্যের পরিচয় দিয়ে রাজকুমারী এসে দাঁড়ালেন অর্জুনের সামনে। অর্জুন বললেন, -'অসাধ্যসাধন করেছেন আপনি রাজকুমারী। এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ভাবীকালের সামনে। আপনার জন্য আমি গর্বিত।'

-'আপনাকে গুরুদক্ষিণা দেওয়ার যোগ্যতা কি আমি অর্জন করতে পেরেছি কুমার?'

একটু হেসে ওঠেন অর্জুন। বলেন, -'নিশ্চই। আপনার যা ইচ্ছা, তাই দেবেন রাজকুমারী।'

এবার এগিয়ে আসেন মহারাজ চিত্রবাহন। বলেন, -'গুরুদক্ষিণা হিসাবে আমি আপনার হাতে আমার এই কন্যাটিকে তুলে দিতে চাই কুমার অর্জুন।'

সহসা যেন এক ঝোড়ো হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু, একটি পেলব আবরণ যেন উন্মোচিত হয়ে গেল। অস্তমিত সূর্য যেন তাঁর দিনের আলোর শেষ পরশ রেখে গেলেন রাজকুমারীর জন্য এবং তা যেন এক ঝলক টাটকা আবীরের মত রাজকুমারীর দু'গালে ছড়িয়ে পড়ল।

-'এ কি বলছেন মহারাজ? আপনার কন্যাকে সেই চোখে তো আমি দেখিনি কোনোদিন?'

-'আমি তা জানি রাজকুমার। কিন্তু আপনিই বলুন, আমার এই কন্যার যোগ্য স্বামী আপনি ছাড়া আর কে হতে পারেন? কোন পুরুষ ওঁর এই শৌর্যকে ধারণ করতে পারবেন? কে ই বা ওঁকে বুঝবেন এত ভাল করে? তাছাড়া, আমার কন্যার মনের কথা আমার কাছে লুকোনো নেই। তিনি মনে মনে আপনাকেই গ্রহণ করেছেন। এছাড়াও...'

-'এছাড়া কি মহারাজ?'--অর্জুন বিস্মিত।

-'এছাড়াও আমি চাই, আমাদের এই বন্ধুত্ব আত্মীয়তায় পরিবর্তিত হোক। সম্রাট যুধিষ্ঠিরের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক হবে, এর থেকে বেশি আর কি চাওয়ার থাকতে পারে?'

-'কিন্তু আপনার কন্যাকে বিবাহের পরে এই রাজ্যেই থাকতে হবে, এরকম কথা আপনার মুখ থেকেই আমি শুনেছি। আমার পক্ষে তো এই রাজ্যে আজীবন বসবাস করা সম্ভব নয় মহারাজ। আমাকে যে ফিরতে হবে।'

এই কথার উত্তর দিলেন চিত্রাঙ্গদা নিজে। -'আপনাকে আমি বেঁধে রাখব না কুমার। রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদা আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, এই রাজ্যের উত্তরাধিকারী আসা পর্যন্ত সে আপনাকে নিজের কাছে রাখবে। তারপর আপনি মুক্ত। আপনার প্রেমিকা বা সখী হয়ে নয়, আমি আপনার রক্ষাকবচ হয়ে থাকব। সংকটে, আপদে, বিপদে, যুদ্ধে আপনি আমাকে এবং আমার সন্তানকে পাশে পাবেন। যে কোনো কঠিন সময়ে আপনি ডাকলেই আমার সাড়া পাবেন, সর্বশক্তি দিয়ে আমার যা করার আমি তাই করব আপনার এবং আপনার জ্যেষ্ঠের জন্য। ইন্দ্রপ্রস্হে প্রবেশ করার অধিকার আমি কোনোদিন দাবী করব না, তবে আমাদের এই রাজ্যে আপনার জন্য দ্বার থাকবে সর্বদা অবারিত। এর বেশি কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই রাজকুমার। এই আমার গুরুদক্ষিণা।'

-'না রাজকুমারী। এ আমার জীবনেরও পরম পাওয়া। অর্জুনের চোখ কখনো মানুষ চিনতে ভুল করে না। আপনাকে নিজের জীবনে পেলে আমিও নিজেকে ধন্য মনে করব। আমি মহারাজ চিত্রবাহনের প্রস্তাবকে সানন্দে স্বীকার করছি। কিন্তু আমার জ্যেষ্ঠ এবং সখা বাসুদেবকে এই আনন্দ সংবাদটি দেওয়া প্রয়োজন।'

-'সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে রাজকুমার।'--মণিপুরের প্রধান মন্ত্রী আদেশ দেন সেনাপতিকে, এই সংবাদ যেন শীঘ্র ইন্দ্রপ্রস্হে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়।

শুভলগ্নে অর্জুনের বিবাহ সুসম্পন্ন হয় চিত্রাঙ্গদার সাথে। অর্জুন ঠিক চিনেছেন এই রাজকুমারীকে। তিনি তেজী, তিনি সৎ, তিনি আত্মপ্রত্যয়ী। তিনি আপন ব্যক্তিত্বে অনন্য। সবার থেকে আলাদা। কিন্তু অর্জুন এতদিনেও তাঁর নারী মনটিকে হয়ত বা বুঝতে পারেন নি। একথা সত্যিই, এইরকম খাঁটি হীরের মূল্য যেকোনো সাধারণ মানুষ হয়ত বুঝতেই পারবে না। না পারুক, অর্জুন ঠিকই বুঝবেন! কিন্তু একটা প্রশ্ন অর্জুনের মনে রয়েই গেল, এ কেমন নারী যিনি নিজের অধিকারটুকু পর্যন্ত নিজের কাছে রাখতে চান না? অর্জুন দেখেছেন পাঞ্চালীকে, তাঁর অধিকারবোধ একটু আলাদা মাত্রা পায় অর্জুনের কাছে। হতে পারেন তিনি ইন্দ্রপ্রস্হের পাটরাণী, অর্জুনের কাছে তিনি শুধুই একজন সখী। তাঁর সমস্ত আবদারের কেন্দ্রবিন্দু অর্জুন। তাঁর অন্য স্ত্রী উলুপী যেন শুধু একজন সেবিকা, অর্জুনের সেবাতেই তাঁর তৃপ্তি। কিন্তু চিত্রাঙ্গদার কথা আলাদা। তিনি সখী, তিনি সেবিকা, তিনি প্রেমিকা, তিনি স্ত্রী, আবার কখনো কখনো অসম্ভব নির্লিপ্ত। কখনো বা তিনি পরামর্শদাতা, কখনো গ্রহীতা। কিন্তু কখনোই কোনো বিষয়ে অহেতুক কৌতূহল নেই তাঁর। তাঁকে সাথে নিয়ে অর্জুনের ভালোই কাটছিল। তারপর এক শুভদিনে অর্জুন এবং চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন জন্ম নিল। গোটা রাজ্যে খুশির হাওয়া বয়ে যাচ্ছে যেন। কিন্তু চিত্রাঙ্গদার মুখ এমন মলিন কেন? অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন তাঁকে।

-'তোমার ফেরার যে সময় হল কুমার।'--চিত্রাঙ্গদা বললেন।

-'অর্থাৎ?'

-'মনে আছে কুমার, আমি বিবাহের সময় তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, এই রাজ্যের উত্তরাধিকারী আসার পর তোমাকে একটা দিনও আর বেঁধে রাখব না।'

সত্যিই অর্জুনের মনে ছিল না একথা। -'কিন্তু আজ খুশির দিনে এ কথার কি প্রয়োজন চিত্রা?'--অর্জুন শুধোলেন।

-'প্রয়োজন আছে কুমার। তোমার রাজ্য, রাজ্যবাসী, তোমার জ্যেষ্ঠ, তোমার সখা, তোমার স্ত্রী মহারাণী পাঞ্চালী যে তোমার জন্য অপেক্ষারত। আমার প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে ওঁরা আমাকে কি ভাববেন বলো তো? আমি সত্যভঙ্গ করতে চাই না কুমার।'

-'আজ একথা থাক চিত্রা। কিছুদিন সময় দাও, আমার পুত্রের সান্নিধ্য থেকে আমাকে বঞ্চিত কোরো না।'

-'তবে থাক।' --দীর্ঘশ্বাস নির্গত হয় রাজকুমারীর কন্ঠ থেকে। আস্তে আস্তে বভ্রু বড় হতে থাকে, আর চিত্রাঙ্গদাও তাঁর প্রতিশ্রুতি মনে করাতে থাকেন অর্জুনকে। বভ্রু তিন বছরের হয়ে গেল। রাজকুমারীর কাছে এই তিনবছরের প্রতিটা দিন যেন একযুগ মনে হয়েছে। আবার একদিন সেই কথা বললেন অর্জুনকে।

-'এতদিন একসাথে থাকার পরেও আমি তোমাকে চিনতে পারলাম না চিত্রা। এত নিষ্ঠুর কেন তুমি? কেন আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাইছ? কেন বভ্রুর কাছ থেকে আমাকে আলাদা করতে চাইছ? ও কি তোমার একার পুত্র?'

-'ভুল বুঝছ কুমার। তোমাকে তাড়াই আমার সাধ্য কি? কিন্তু কেবলই যেন মনে হচ্ছে মহাবীর অর্জুন নিজের জীবনের উদ্দেশ্য ভুলতে বসেছেন। বাসুদেবের কথাও আজ তোমার মনে নেই? তিনি কি উদ্দেশ্যে তোমাকে পথে বের করেছিলেন তা কি তুমি সম্পূর্ণ ভুলে গেছ? কিন্তু তুমি ভুললেও আমি তোমাকে ভুলতে দেব না কুমার। আমি তোমার সহধর্মিনী, ধর্মের পথ থেকে চ্যুত হতে তো তোমাকে আমি দেব না!'

সেই কণ্ঠস্বর! এ কণ্ঠস্বর অর্জুনের চেনা। এই আত্মপ্রত্যয়ের কাছে, এ ব্যক্তিত্বের কাছে কেউ মাথা তুলে প্রতিবাদ করতে পারে না। এ কণ্ঠস্বর এক ন্যায়াধীশের।

কিছু করার নেই। অর্জুনকে ফিরতে হবে। পাঁচ বছর আগে এক দ্বিপ্রহরে চিত্রাঙ্গদার সাথে তাঁর প্রথম দেখা, আর আজ সেইরকমই এক দ্বিপ্রহর। অর্জুন নয় পুরুষমানুষ, তাঁর চোখে জল দেখা যায় না। কিন্তু ওই রমণী এত কঠিন কেন? তাঁর কি এতটুকু মন খারাপ করে না স্বামীকে ছেড়ে দিতে? অর্জুন ভাবছেন।

-'চিন্তা কোরো না কুমার। তুমি যে শস্ত্রশিক্ষা আমাকে দিয়েছ, সেই শিক্ষায় আমি তোমার পুত্রকে বড় করে তুলব। প্রয়োজন যেদিন পড়বে, আমাকে আর আমার পুত্রকে তুমি তোমার দুই পাশে পাবে।'---এই ছিল চিত্রাঙ্গদার শেষ কথা।

অর্জুন আবার পথে নেমেছেন। দীর্ঘ প্রবাসের পর এবার তাঁকে যেতে হবে প্রভাসতীর্থে। সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁর সুহৃদ, তাঁর মিত্র, তাঁর আজীবনের সখা বাসুদেব। অর্জুন শুধু চেয়েছিলেন চিত্রাঙ্গদার আয়ত চোখদুটিতে একটু ব্যথার স্পর্শ নিজের চোখে মেখে বিদায় নিতে। কিন্তু সেরকম কোনো আভাস তিনি পান নি।

অর্জুন জানেন না, যে মুহূর্তে তাঁর অশ্ব চিত্রাঙ্গদার দৃষ্টিসীমা থেকে মিলিয়ে গেল, সেই মুহূর্তে তাঁর চিত্রার সেই অতি কঠিন নিষ্ঠুর চোখ দুটি থেকে জলের ধারা নেমেছিল। তার সাক্ষী স্বয়ং মহাকাল। কিন্তু কাঁদার অবকাশ যে তাঁর নেই। ছোট্ট বভ্রুকে যে তাঁর পিতার মত করেই তাঁকে গড়ে তুলতে হবে। আজ তিনি একাকী। এ গুরুদায়িত্ব বহন করার একক ক্ষমতা তাঁর আছে, এ কথা অর্জুন নিজেও জানেন।

সামনে আবার এক লড়াই। চিত্রাঙ্গদা পারবেন, নিশ্চই পারবেন অর্জুনের স্বপ্ন সফল করে তুলতে। একদিন অর্জুন নিজেই গর্ব করবেন বভ্রুকে দেখে, স্বীকার করবেন তাঁর চিত্রা পেরেছে। সেই দিনটার জন্য আজ থেকে আবার লড়াই শুরু।

এ লড়াই রাজেন্দ্রনন্দিনী চিত্রাঙ্গদার।

 

প্রচ্ছদ - কৌস্তভ চক্রবর্তী

Redirect to Address page

Updating Subscription details

Redirecting...Please Wait